বাংলার ট্যুরিষ্ট

বাংলার ট্যুরিষ্ট

নীল গিরির পথে...... লিখেছেনঃ অপরাজিত

বান্দরবানের নীল গিরি যাবার প্রথম পরিকল্পনা আমার মাথায় আসে তখনকার অস্থায়ী সরকারপ্রধাণ ফখরুদ্দিনের অবকাশ যাপনের জন্য নীল গিরি সফরের মাধ্যমে। এ সফরের ঘটনা আমি পত্রিকার মাধ্যমে পড়েছিলাম। পত্রিকার নীল গিরি সম্বন্ধে অতিরঞ্জিত লেখার দরুণ নীল গিরি ঘোরার জন্য আমি প্রায় ব্যাকুল হয়ে উঠি। কিন্তু উৎসাহ থমকে গেল যখন শুনলাম জায়গাটি খুবই দূর্গম এলাকায় এবং সরকারী প্রোটোকল ছাড়া সেখানে সাধারন ভ্রমনকারীদের যাত্রা করাটা খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। কিন্তু স্বপ্ন যে এত দ্রুত বাস্তবতা লাভ করবে তা বুঝতে পারিনি।

সৌভাগ্যবশত বাবা একটি সরকারী গুরুতবপূর্ণ দফতরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। বছর দুয়েক আগে বাবা চট্টগ্রামে বদলী হয়ে এসেছিলেন তার দফতরের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে। তখনি সরকারী প্রোটোকলের চিন্তা মাথা থেকে দূর হয়ে যায় নীল গিরি যাবার পথে । বাবার কাছে বেশ পীড়াপীড়ি করলাম নীল গিরি যাবার জন্য। প্রথম দিকে নিম রাজি হলেও পরে অনুমতি দিলেন।

এরপর আমাকে পায় কে! অতি উৎসাহের সাথে তোড়জোড় শুরু করে দিলাম নীল গিরি যাবার জন্য। প্রথমে আমরা চট্টগ্রাম থেকে বান্দরবাণে গিয়ে সেখানে থেকে পরের দিন নীল গিরির উদ্দেশে রওনা করলাম।

নীল গিরি অবস্থিত বান্দরবান-থানচি মহাসড়কের মাঝে। পুরোটাই পাহাড়ী সড়ক। ভয়াবহ এবং দূর্গম। আমরা যখন গিয়েছিলাম তখন ছিল বর্ষাকাল। পথ ছিল ভয়াবহ রকমের পিচ্ছিল। তবে আশার কথা ,আমাদের গাড়ির চালক ছিলেন দক্ষ। তিনি পাহাড়ী রাস্তার বাঁকগুলি যেভাবে মোকাবেলা করছিলেন একদিকে যেমন ভয় পাচ্ছিলাম অন্য দিকে বেশ রোমাঞ্চও অনুভব করছিলাম। সব ভুলে গেলাম যখন দেখলাম রাস্তার দুই পাশের দূশ্যসমূহ। অসাধারণ!!! কে বলে আমার বাংলাদেশ সৌন্দর্যহীন? অনায়াসে সুইজারল্যান্ডকে হার মানাতে পারে। এ সব দেখে দেখে বিভোর হয়ে গেলাম নীল গিরির সৌন্দর্যে আপ্লুত হবার।

অবশেষে এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। নীল গিরি মূলত সেনাবাহিণীর নিয়ন্ত্রনে একটি ঘাটি যাকে রিসর্টে পরিনত করা হয়েছে সৌন্দর্যের জন্য। সেনাবাহিণীর ঘাটিটি বেশ উচুতে। আমরা গাড়ি নিয়ে সোজা উপরে উঠে গেলাম। সেখানে একজন সিপাহি আমাদের কাছে এলেন পরিচয় জানতে। আমরা পরিচয় পর্ব শেষ করলাম।

গাড়ি রেখে আমরা আরো উপরে রিসর্টে প্রবেশ করলাম। রিসর্ট টি পুরো স্টিলের গ্রীল দিয়ে ঘেরা। এর মাঝে আবার একটি কম্পল্কেস।

কম্পল্কেসে দেখলাম সেনাবাহিণীর কর্মকর্তারা তাদের স্ত্রী-পরিজন নিয়ে বেশ উপভোগ করছেন চারদিকের দৃশ্যাবলী। আমরাও বেশ ঝটপট ছবি তুলতে লাগলাম। 

নীল গিরির সবচেয়ে আসল মজা হচ্ছে এখানে মেঘ স্পর্শ করা যায়- বাংলাদেশের দার্জিলিং বললেও অতি উক্তি হবে না। তবে সবচেয়ে যে জিনিসটা আমাকে বেশি অভিভূত করেছে নীল গিরির অদূরে এক টি পাহাড় আছে যেখানে রাশি রাশি মেঘ কুন্ডলী পাকিয়ে ঘুরছে(ছবি দেখুন)। আমি এক মুহূর্তের জন্য হতবিহবল হয়ে গেলাম। স্থানীয়দের বলে দেখলাম তারাও এ ব্যাপারে কিছু জানে না। কিন্তু আমি তখন ভাবলাম; এখনও ভাবি এটাই হয়ত সেই রহস্যময় নীল গিরি যা আমার স্মৃতির মনিকোঠায় এখন অম্লান হয়ে আছে।

নীল গিরি বান্দরবান শহর থেকে প্রায় ৫০-৫৫ কিমি। যাবার জন্য উত্তম সময় হচ্ছে বর্ষাকাল। নীল গিরিতে রাত্রি যাপন করতে পারবেন তবে সেনাবাহিণীর অনুমতি লাগবে,(শুনেছি নীল গিরিতে রাত্রি যাপন করা এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা- যদিও এ বান্দার সুযোগ হয় নি) Shock খুব একটা কঠিন কাজ না। আর হ্যা রাত্রিযাপন করতে চাইলে অবশ্যি খাবার আগে থেকে নিয়ে আসবেন কেননা এখানে খাবার পাওয়া যায় না। যোগাযোগ? বান্দরবান থেকে “চান্দের গাড়ি “ অহরহ নীল গিরি যাচ্ছে। ফাউ হিসেবে ঘুরতে পারেন “চিম্বুক পাহাড়”, নীল গিরি যাবার পথেই পড়ে। আর কি? নিজেরাই ঘুরে আসুন না ওখানে; আমি সব বললে তো মজা নষ্ট হয়ে যাবে তাই না?

0 টি মন্তব্য:

Post a Comment